• রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

‘সনদ’ ও ‘গণভোট’ নিয়ে বুর্জোয়া রাজনীতির কোন্দল

‘সনদ’ ও ‘গণভোট’ নিয়ে বুর্জোয়া রাজনীতির কোন্দল

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

বর্তমানে ‘জুলাই সনদ’ ও ‘গণভোটে’র রায় বাস্তবায়ন নিয়ে একদিকে বিএনপি সরকার এবং অন্যদিকে বিরোধী জোট জামাত-এনসিপিসহ ধর্মবাদী দলগুলোর মধ্যে তুমুল কোন্দল চলছে। বিরোধীরা বলছে বিএনপি সরকার ‘সনদ’ ও গণভোটের রায়ের সাথে বেইমানি করছে। তারা সংসদে তুমুল হৈচৈ, ওয়াকআউট করছে এবং মাঠে আন্দোলন করে সরকার পতনের হুমকিও দিয়ে চলেছে। ৫ সেপ্টেম্বর থেকে লংমার্চ শুরু করেছে, যাকে অবশ্য অনেকে বলছেন লং ড্রাইভ। এরকম আরো পাঁচটি লংমার্চ তারা করবে নভেম্বর পর্যন্ত। 

যদিও এদেরই কেউ কেউ আবার বলছে এই লংমার্চ ও আন্দোলন সরকার উচ্ছেদের জন্য নয়, সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির জন্য। তাহলে কি এটা আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনের মাঠ গরম করে নিজেদের পাল্লা ভারি করার কৌশল? 

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট হাসিনা-বিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের পর ড.ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার” রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে একটি “জাতীয় ঐকমত্য কমিশন” গঠন করেছিল ফেব্রুয়ারি’২৫-এ। এই কমিশন দ্বারা একটি সনদ ঘোষিত হয় প্রায় নয় মাস পর। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবরে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে সনদটি প্রকাশ করা হয়। যদিও সংসদীয় বাম দলগুলো মুজিব-আওয়ামী ’৭২-সংবিধানের প্রতি তাদের আনুগত্যের কারণে তাতে স্বাক্ষর করেনি। এই সনদটি ছিল “বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির ‘তৃতীয় শক্তি’র রাজনীতি ও আপস-ফমুর্লা, বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির হাসিনা-বিরোধী অংশগুলোর আপাত ঐক্য ও কোন্দলের দলিল”। সনদ ঘোষণার পর পরই “আন্দোলন” এভাবেই তাকে মূল্যায়ন করেছিল। 

বিএনপি এই সনদে স্বাক্ষর করলেও গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু প্রশ্নে দ্বিমত প্রকাশ করেছিল। তাসত্ত্বেও আমেরিকান নাগরিক আলী রিয়াজের নেতৃত্বাধীন কমিশনের পরামর্শে ইউনূস সরকার ২০২৬-এ যে গণভোটের আয়োজন করে তাতে সনদে বিভিন্ন দলের উত্থাপিত দ্বিমতগুলো উল্লেখ করা হয়নি। এই শয়তানি ও প্রতারণাকে জামাত-এনসিপি নিঃশর্ত সমর্থন দেয়। তবে বিএনপি তখন একে একটি প্রতারণা বলে চিহ্নিত করেছিল। যদিও তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের কথাও নরমভাবে বলেছিল। তারা তখন পড়েছিল ‘ফাটা বঁাশের চিপায়’। তাদের পক্ষে ‘না’ ভোট বলাও সম্ভব ছিল না, তাহলে আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে ন্যায্য করা হতো। এ অবস্থায় তখন তারা পাল্টা প্রতারণার আশ্রয় নেয় এবং ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসাকে গুরুত্ব দেয়। 

এখন এই বিতর্কিত সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য জামাত-এনসিপি (পশ্চাতে তৃতীয় শক্তি) জেহাদ ঘোষণা করেছে। আর বিএনপি ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েও এখন বলছে তারা তাদের আপত্তিগুলো বাস্তবায়ন করবে না। যদিও আবার বলছে তারা “অক্ষরে অক্ষরে” সনদ বাস্তবায়ন করবে!

জনস্বার্থহীন এমন এক বুর্জোয়া ইস্যুতে এদের এই কোন্দলে জনগণের কী যায় আসে?

নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার-গঠনের পর থেকেই আওয়ামী-বিরোধী এই বুর্জোয়া উপদলগুলোর মধ্যে কোন্দল তীব্র হয়ে উঠেছে। সনদ/গণভোট নিয়ে উভয় পক্ষের অবস্থানেই শ্রমিক, কৃষক, নারী, আদিবাসী, দরিদ্র, সংগ্রামী ছাত্র-তরুণ, দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী বা জনগণের কোনো কর্মসূচি নেই। দু’একটা সংস্কারের যেসব দাবিকে গণমুখী বলা যায় সেগুলোও এরা কেউই মানছে না।

প্রথম বিষয় হলো, সরকার বলছে সংবিধান ‘সংশোধন’ হবে, আর বিরোধী বুর্জোয়ারা বলছে ‘সংস্কার’ হবে। এতে কী এমন পার্থক্য হলো? উভয় পক্ষই চলমান সংবিধান মেনে নিয়েছে, তার অধীনে শপথও নিয়েছে। তাহলে এর যেসব পরিবর্তন হবে, সংস্কার বা সংশোধন যে নামেই হোক, তাতো এর মৌলিক কাঠামোর অধীনেই হতে হবে। জামাত ও এনসিপিসহ বুর্জোয়া বিরোধীরা একদিকে সংবিধানের অধীনস্ততাকে মেনে নিয়েছে, অন্যদিকে তাকে আবার হাসিনা ফ্যাসিবাদীও বলছে। এগুলো জনগণের সাথে স্পষ্ট প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।

অবশ্য কেউ কেউ রয়েছে সংবিধানটি বাতিল করতে চায়। মানলাম সেটা। এটা ভালো কথা। কিন্তু এর বদলে আপনাদের নতুন সংবিধানের নীতিগুলো কী হবে? হেফাজত বা চরমোনাই বা এমনকি জামাতও বলেছে ইসলামী সংবিধান বা কোরানের আইন করবে। সেটা কি তালেবানি আফগানিস্তানের কর্মসূচি? নাকি সৌদি বা পাকিস্তানি ফ্যাসিবাদ?

চলমান সংবিধানটি নিঃসন্দেহে প্রতিক্রিয়াশীল। এটা বাতিলযোগ্য। সেটা ভিন্ন পরিসরের বড় আলোচনা। কিন্তু তার প্রতি অনাস্থার অর্থ এটা নয় যে, তার বদলে একটি তালেবানি বা পাকিস্তানি ধরনের সংবিধানের দাবি গ্রহণযোগ্য। অথবা তৃতীয় শক্তির তথাকথিত ‘বিরাজনীতিকরণ’ কোনো ভালো কাজ। এগুলো সুস্পষ্টভাবে প্রতিক্রিয়াশীল ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। 

তথাকথিত সনদ ও গণভোটে জনগণের জন্য কী রয়েছে? কিছুই না। প্রথমত গণভোট ছিল একটি প্রতারণা, কারণ, ৪টি মূল প্রশ্ন এনে, যার মাঝে ৮৪টির মতো বিষয় ছিল, জনগণকে হঁ্যা বা না ভোট দিতে বলা একটি স্পষ্ট প্রতারণা ব্যতীত কিছু ছিল না। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের দালাল তৃতীয় শক্তির বুর্জোয়া সরকার ড.ইউনূসের নেতৃত্বে এ ‘মহান’ কাজটি করেছিল। এবং তাকে বিবিধ দ্বিমত সত্ত্বেও বুর্জোয়া দলগুলো মেনে নিয়েছিল। আর এখন এটাই হয়ে দঁাড়িয়েছে জামাত-এনসিপি’র মৌলিক কর্মসূচি।

সনদে কী ছিল? এই সনদে সকল সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদবিরোধী একটি শব্দও নেই। নেই শ্রমিক-কৃষক, ছাত্র-তরুণ, নারী-আদিবাসী, মধ্যবিত্তসহ নিপীড়িত জাতি ও জনগণের কোনো স্বার্থের কর্মসূচি। 

ছাত্র-তরুণদের অবস্থান ছিল বৈষম্য-বিরোধিতা। তাদের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্য-বিরোধী সমাজ ও শিক্ষানীতি। যদিও তার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা তাদের ছিল না, কারণ তাদের নেতৃত্বরা রাজনীতিগতভাবে বুর্জোয়া লেজুড় ছিল, পরে যার একটা অংশ নতুন পার্টি(এনসিপি) বানিয়ে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বস্ত দালাল ইউনূসের ও পরে জামাতের বিটিম হয়েছে। শ্রমিক ও শ্রমজীবী তরুণরা কি বুর্জোয়া শোষকদের কর্মসূচির জন্য জীবন দিয়েছিলেন? তাদের মুক্তি দূরের কথা, সাধারণ কোনো স্বার্থের বিষয় কি সনদে রয়েছে? কৃষকের কী কর্মসূচি রয়েছে? আদিবাসী জনগণের পৃথক জাতিসত্তাকে পর্যন্ত সনদ স্বীকৃতি দেয়নি, তাদের একটি দাবিও তাতে ছিল না। এই ধরনের এক বুর্জোয়া ঘোষণার জন্য এসব জনগণ জীবন দেননি, জুলাই সৃষ্টি করেননি। কিন্তু বুর্জোয়ারা সবাই যোগসাজশ করে এরকম এক তথাকথিত সনদ চাপিয়ে দিয়েছে তাদের উপর। 

এই রকম এক সনদ আর গণভোটের রায় নিয়ে বুর্জোয়া রাজনীতির কোন্দলে জনগণ কেন সাড়া দেবেন? 

জামাত-এনসিপি জোট জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব-কোন্দলের সাথে বিএনপি’র নেতা-কর্মীদের চঁাদাবাজি, ঘুস-দুর্নীতি, নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানি-সার সংকট নিয়ে জনতুষ্টিবাদী সস্তা বয়ান দিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে মাত্র। অথচ সরকারের বিদেশ নির্ভরতা, গণবিরোধী মূল মূল সিদ্ধান্তগুলোর প্রতিবাদ করছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের মার্কিন ও বিদেশি কোম্পানির সাথে দাসখতমূলক বাণিজ্য, বন্দর চুক্তি অব্যাহত রাখা, বিএনপি সরকারের ইইউ এবং চীনের সাথে বিভিন্ন গণবিরোধী চুক্তি, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ইন্ধনে ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি নৌ-জোটে বাংলাদেশের যোগদান, ৪৪টি রাষ্ট্রয়াত্ত শিল্প-কারখানা এবং জ্বালানিখাত পানির দরে দেশি-বিদেশি মালিকানায় বেসরকারিকরণ প্রশ্নে নিশ্চুপ। চা-গার্মেণ্ট শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, ছঁাটাই, হকার উচ্ছেদ, ব্যাটারি চালিত রিক্সা উচ্ছেদ ষড়যন্ত্র নিয়ে টু-শব্দটি করছে না। বরং ইরানবিরোধী মক্কা জোটে যোগ দেয়ার পক্ষে জামাত নেতা শফিকুর রহমান মত প্রকাশ করেছে। সাম্রাজ্যবাদের দালালী আর কাকে বলে। 

তাই বুর্জোয়া রাজনীতির কোন্দলে সামিল না হয়ে শ্রমিক-কৃষক-দরিদ্র জনগণের পৃথক পতাকা তুলুন, পৃথক ধরনের কর্মসূচিকে নিয়ে আসুন, এবং সকল বুর্জোয়া রাজনীতির কবর রচনার পথে এগিয়ে চলুন।

‘সনদ’ ও ‘গণভোট’ নিয়ে বুর্জোয়া রাজনীতির কোন্দল

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

বর্তমানে ‘জুলাই সনদ’ ও ‘গণভোটে’র রায় বাস্তবায়ন নিয়ে একদিকে বিএনপি সরকার এবং অন্যদিকে বিরোধী জোট জামাত-এনসিপিসহ ধর্মবাদী দলগুলোর মধ্যে তুমুল কোন্দল চলছে। বিরোধীরা বলছে বিএনপি সরকার ‘সনদ’ ও গণভোটের রায়ের সাথে বেইমানি করছে। তারা সংসদে তুমুল হৈচৈ, ওয়াকআউট করছে এবং মাঠে আন্দোলন করে সরকার পতনের হুমকিও দিয়ে চলেছে। ৫ সেপ্টেম্বর থেকে লংমার্চ শুরু করেছে, যাকে অবশ্য অনেকে বলছেন লং ড্রাইভ। এরকম আরো পাঁচটি লংমার্চ তারা করবে নভেম্বর পর্যন্ত। 

যদিও এদেরই কেউ কেউ আবার বলছে এই লংমার্চ ও আন্দোলন সরকার উচ্ছেদের জন্য নয়, সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির জন্য। তাহলে কি এটা আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনের মাঠ গরম করে নিজেদের পাল্লা ভারি করার কৌশল? 

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট হাসিনা-বিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের পর ড.ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার” রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে একটি “জাতীয় ঐকমত্য কমিশন” গঠন করেছিল ফেব্রুয়ারি’২৫-এ। এই কমিশন দ্বারা একটি সনদ ঘোষিত হয় প্রায় নয় মাস পর। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবরে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে সনদটি প্রকাশ করা হয়। যদিও সংসদীয় বাম দলগুলো মুজিব-আওয়ামী ’৭২-সংবিধানের প্রতি তাদের আনুগত্যের কারণে তাতে স্বাক্ষর করেনি। এই সনদটি ছিল “বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির ‘তৃতীয় শক্তি’র রাজনীতি ও আপস-ফমুর্লা, বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির হাসিনা-বিরোধী অংশগুলোর আপাত ঐক্য ও কোন্দলের দলিল”। সনদ ঘোষণার পর পরই “আন্দোলন” এভাবেই তাকে মূল্যায়ন করেছিল। 

বিএনপি এই সনদে স্বাক্ষর করলেও গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু প্রশ্নে দ্বিমত প্রকাশ করেছিল। তাসত্ত্বেও আমেরিকান নাগরিক আলী রিয়াজের নেতৃত্বাধীন কমিশনের পরামর্শে ইউনূস সরকার ২০২৬-এ যে গণভোটের আয়োজন করে তাতে সনদে বিভিন্ন দলের উত্থাপিত দ্বিমতগুলো উল্লেখ করা হয়নি। এই শয়তানি ও প্রতারণাকে জামাত-এনসিপি নিঃশর্ত সমর্থন দেয়। তবে বিএনপি তখন একে একটি প্রতারণা বলে চিহ্নিত করেছিল। যদিও তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের কথাও নরমভাবে বলেছিল। তারা তখন পড়েছিল ‘ফাটা বঁাশের চিপায়’। তাদের পক্ষে ‘না’ ভোট বলাও সম্ভব ছিল না, তাহলে আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে ন্যায্য করা হতো। এ অবস্থায় তখন তারা পাল্টা প্রতারণার আশ্রয় নেয় এবং ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসাকে গুরুত্ব দেয়। 

এখন এই বিতর্কিত সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য জামাত-এনসিপি (পশ্চাতে তৃতীয় শক্তি) জেহাদ ঘোষণা করেছে। আর বিএনপি ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েও এখন বলছে তারা তাদের আপত্তিগুলো বাস্তবায়ন করবে না। যদিও আবার বলছে তারা “অক্ষরে অক্ষরে” সনদ বাস্তবায়ন করবে!

জনস্বার্থহীন এমন এক বুর্জোয়া ইস্যুতে এদের এই কোন্দলে জনগণের কী যায় আসে?

নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার-গঠনের পর থেকেই আওয়ামী-বিরোধী এই বুর্জোয়া উপদলগুলোর মধ্যে কোন্দল তীব্র হয়ে উঠেছে। সনদ/গণভোট নিয়ে উভয় পক্ষের অবস্থানেই শ্রমিক, কৃষক, নারী, আদিবাসী, দরিদ্র, সংগ্রামী ছাত্র-তরুণ, দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী বা জনগণের কোনো কর্মসূচি নেই। দু’একটা সংস্কারের যেসব দাবিকে গণমুখী বলা যায় সেগুলোও এরা কেউই মানছে না।

প্রথম বিষয় হলো, সরকার বলছে সংবিধান ‘সংশোধন’ হবে, আর বিরোধী বুর্জোয়ারা বলছে ‘সংস্কার’ হবে। এতে কী এমন পার্থক্য হলো? উভয় পক্ষই চলমান সংবিধান মেনে নিয়েছে, তার অধীনে শপথও নিয়েছে। তাহলে এর যেসব পরিবর্তন হবে, সংস্কার বা সংশোধন যে নামেই হোক, তাতো এর মৌলিক কাঠামোর অধীনেই হতে হবে। জামাত ও এনসিপিসহ বুর্জোয়া বিরোধীরা একদিকে সংবিধানের অধীনস্ততাকে মেনে নিয়েছে, অন্যদিকে তাকে আবার হাসিনা ফ্যাসিবাদীও বলছে। এগুলো জনগণের সাথে স্পষ্ট প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।

অবশ্য কেউ কেউ রয়েছে সংবিধানটি বাতিল করতে চায়। মানলাম সেটা। এটা ভালো কথা। কিন্তু এর বদলে আপনাদের নতুন সংবিধানের নীতিগুলো কী হবে? হেফাজত বা চরমোনাই বা এমনকি জামাতও বলেছে ইসলামী সংবিধান বা কোরানের আইন করবে। সেটা কি তালেবানি আফগানিস্তানের কর্মসূচি? নাকি সৌদি বা পাকিস্তানি ফ্যাসিবাদ?

চলমান সংবিধানটি নিঃসন্দেহে প্রতিক্রিয়াশীল। এটা বাতিলযোগ্য। সেটা ভিন্ন পরিসরের বড় আলোচনা। কিন্তু তার প্রতি অনাস্থার অর্থ এটা নয় যে, তার বদলে একটি তালেবানি বা পাকিস্তানি ধরনের সংবিধানের দাবি গ্রহণযোগ্য। অথবা তৃতীয় শক্তির তথাকথিত ‘বিরাজনীতিকরণ’ কোনো ভালো কাজ। এগুলো সুস্পষ্টভাবে প্রতিক্রিয়াশীল ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। 

তথাকথিত সনদ ও গণভোটে জনগণের জন্য কী রয়েছে? কিছুই না। প্রথমত গণভোট ছিল একটি প্রতারণা, কারণ, ৪টি মূল প্রশ্ন এনে, যার মাঝে ৮৪টির মতো বিষয় ছিল, জনগণকে হঁ্যা বা না ভোট দিতে বলা একটি স্পষ্ট প্রতারণা ব্যতীত কিছু ছিল না। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের দালাল তৃতীয় শক্তির বুর্জোয়া সরকার ড.ইউনূসের নেতৃত্বে এ ‘মহান’ কাজটি করেছিল। এবং তাকে বিবিধ দ্বিমত সত্ত্বেও বুর্জোয়া দলগুলো মেনে নিয়েছিল। আর এখন এটাই হয়ে দঁাড়িয়েছে জামাত-এনসিপি’র মৌলিক কর্মসূচি।

সনদে কী ছিল? এই সনদে সকল সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদবিরোধী একটি শব্দও নেই। নেই শ্রমিক-কৃষক, ছাত্র-তরুণ, নারী-আদিবাসী, মধ্যবিত্তসহ নিপীড়িত জাতি ও জনগণের কোনো স্বার্থের কর্মসূচি। 

ছাত্র-তরুণদের অবস্থান ছিল বৈষম্য-বিরোধিতা। তাদের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্য-বিরোধী সমাজ ও শিক্ষানীতি। যদিও তার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা তাদের ছিল না, কারণ তাদের নেতৃত্বরা রাজনীতিগতভাবে বুর্জোয়া লেজুড় ছিল, পরে যার একটা অংশ নতুন পার্টি(এনসিপি) বানিয়ে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বস্ত দালাল ইউনূসের ও পরে জামাতের বিটিম হয়েছে। শ্রমিক ও শ্রমজীবী তরুণরা কি বুর্জোয়া শোষকদের কর্মসূচির জন্য জীবন দিয়েছিলেন? তাদের মুক্তি দূরের কথা, সাধারণ কোনো স্বার্থের বিষয় কি সনদে রয়েছে? কৃষকের কী কর্মসূচি রয়েছে? আদিবাসী জনগণের পৃথক জাতিসত্তাকে পর্যন্ত সনদ স্বীকৃতি দেয়নি, তাদের একটি দাবিও তাতে ছিল না। এই ধরনের এক বুর্জোয়া ঘোষণার জন্য এসব জনগণ জীবন দেননি, জুলাই সৃষ্টি করেননি। কিন্তু বুর্জোয়ারা সবাই যোগসাজশ করে এরকম এক তথাকথিত সনদ চাপিয়ে দিয়েছে তাদের উপর। 

এই রকম এক সনদ আর গণভোটের রায় নিয়ে বুর্জোয়া রাজনীতির কোন্দলে জনগণ কেন সাড়া দেবেন? 

জামাত-এনসিপি জোট জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব-কোন্দলের সাথে বিএনপি’র নেতা-কর্মীদের চঁাদাবাজি, ঘুস-দুর্নীতি, নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানি-সার সংকট নিয়ে জনতুষ্টিবাদী সস্তা বয়ান দিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে মাত্র। অথচ সরকারের বিদেশ নির্ভরতা, গণবিরোধী মূল মূল সিদ্ধান্তগুলোর প্রতিবাদ করছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের মার্কিন ও বিদেশি কোম্পানির সাথে দাসখতমূলক বাণিজ্য, বন্দর চুক্তি অব্যাহত রাখা, বিএনপি সরকারের ইইউ এবং চীনের সাথে বিভিন্ন গণবিরোধী চুক্তি, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ইন্ধনে ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি নৌ-জোটে বাংলাদেশের যোগদান, ৪৪টি রাষ্ট্রয়াত্ত শিল্প-কারখানা এবং জ্বালানিখাত পানির দরে দেশি-বিদেশি মালিকানায় বেসরকারিকরণ প্রশ্নে নিশ্চুপ। চা-গার্মেণ্ট শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, ছঁাটাই, হকার উচ্ছেদ, ব্যাটারি চালিত রিক্সা উচ্ছেদ ষড়যন্ত্র নিয়ে টু-শব্দটি করছে না। বরং ইরানবিরোধী মক্কা জোটে যোগ দেয়ার পক্ষে জামাত নেতা শফিকুর রহমান মত প্রকাশ করেছে। সাম্রাজ্যবাদের দালালী আর কাকে বলে। 

তাই বুর্জোয়া রাজনীতির কোন্দলে সামিল না হয়ে শ্রমিক-কৃষক-দরিদ্র জনগণের পৃথক পতাকা তুলুন, পৃথক ধরনের কর্মসূচিকে নিয়ে আসুন, এবং সকল বুর্জোয়া রাজনীতির কবর রচনার পথে এগিয়ে চলুন।

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র